বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পর অ্যাগ্রিগেটর প্রতিষ্ঠানগুলো রেমিট্যান্সের ডলার বিক্রি কমিয়েছে। গতকাল এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দেশের ব্যাংকগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী ডলার কিনতে পারেনি। অ্যাগ্রিগেটররা ডলার ধরে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অ্যাগ্রিগেটর হলো সেসব বড় মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছোট এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে রেমিট্যান্স বা আন্তঃদেশীয় লেনদেনের অর্থ সংগ্রহ করে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বাজারে মাস্টারকার্ড, ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, টেরাপে, মানিগ্রাম ও এনইসি মানি ট্রান্সফারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরে দেশের রেমিট্যান্সের বাজারে অ্যাগ্রিগেটররা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্ধারণ করা ডলার দরেই ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কিনতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ চুক্তির শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বুধবার ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ঘোষণার পর গতকাল ছিল প্রথম কর্মদিবস। দিনের শুরুতে ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন যে ১২২ টাকা ৫০ পয়সার বেশি দরে কেউ রেমিট্যান্স কিনবেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকেও একই ধরনের পরামর্শ দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দেশের অন্তত তিনটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, বেশকিছু মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান গতকাল ডলারের বাড়তি দর দাবি করেছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কারণে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে মানি ট্রান্সফার ও অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো ডলার বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ডলার ধরে রেখে তারা আগামী সপ্তাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের এ দাবির কোনো সত্যতা নেই বলে জানান মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই বাজারে ডলারের দর স্থিতিশীল। ডলারপ্রতি ৩০-৫০ পয়সা ওঠানামা করছিল। মানি ট্রান্সফার কোম্পানি হিসেবে আমরা চাইলেও ডলার ধরে রাখার সুযোগ নেই। আমরা বাজারের রেট গ্রহণকারী। আর ব্যাংকগুলো বাড়তি দরে ডলার কিনতে না চাইলে আমরা বিক্রি করব কোথায়? তবে কেউ যাতে অনৈতিক সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ভালো সময়ে এসে ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়েছে। আকুর পেমেন্টসহ সরকারি-বেসরকারি খাতের যেসব বৈদেশিক দায় বকেয়া ছিল, এরই মধ্যে সেগুলোর বেশির ভাগ পরিশোধ করা হয়েছে। এখন আর জরুরি কোনো দায় পরিশোধের চাপ নেই। অন্যদিকে আসন্ন কোরবানি ঈদ উপলক্ষে বাড়তি রেমিট্যান্স দেশে আসবে। বাড়তি দরে ডলার কিনতে হবে এমন কোনো প্রয়োজনীয়তা ব্যাংকের থাকবে না।’
বাংলাদেশের ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে রেমিট্যান্স। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে ২ হাজার ৫৩৬ কোটি বা ২৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। প্রবাসীদের পাঠানো এ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে আসে। পাঁচ-সাত বছর আগেও রেমিট্যান্সের বাজার ছিল ছোট মানি এক্সচেঞ্জনির্ভর। এসব মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে ব্যাংক ডলার সংগ্রহ করত। কিন্তু এখন রেমিট্যান্সের বাজার অ্যাগ্রিগেটরনির্ভর হয়ে উঠেছে। ছোট মানি এক্সচেঞ্জগুলো ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি না করে অ্যাগ্রিগেটরদের দিচ্ছে। তারা সংগৃহীত রেমিট্যান্স দরকষাকষির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলোর কাছে বেশি মূল্যে বিক্রি করছে।
বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বাজারে বড় অ্যাগ্রিগেটর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ইনস্ট্যান্ট ক্যাশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ প্রতিষ্ঠানটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আন্তঃদেশীয় রেমিট্যান্সের বাজারে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ তারা কিনে নেয়। এরপর সেগুলো বেশি দরে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করে। আর মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও মানিগ্রাম যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি। এসব মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশীদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানি ট্রান্সফার কোম্পানি হলো টেরাপে। এ প্রতিষ্ঠানটিও বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বাজারের বড় অ্যাগ্রিগেটর হয়ে উঠেছে। অ্যাগ্রিগেটরদের মধ্যে এনইসি মানি ট্রান্সফার বাংলাদেশী কোম্পানি।
দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রামের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে ডলার আসছে তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্স হিসেবে দেখাচ্ছে। এ কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে শীর্ষ উৎসের নাম যুক্তরাষ্ট্র। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নামে দেখানো প্রবাসী আয়ের বড় অংশ সংগ্রহ করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। একইভাবে টেরাপের মাধ্যমে আসা অর্থ দেখানো হচ্ছে যুক্তরাজ্যের রেমিট্যান্স হিসেবে। আর ইনস্ট্যান্ট ক্যাশের মাধ্যমে আসা অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তাই অ্যাগ্রিগেটরদের কারণে রেমিট্যান্সের উৎস দেশের পরিসংখ্যানও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেমিট্যান্সের বাজার এখন অ্যাগ্রিগেটররা নিয়ন্ত্রণ করে। অ্যাগ্রিগেটর প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যে দেশের, তাদের মাধ্যমে আসা অর্থও ওই দেশের হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসী আয় এত বেশি দেখাচ্ছে। অ্যাগ্রিগেটরদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উৎস দেশ নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন।’
বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পর গতকাল ব্যাংকের পাশাপাশি কার্ব মার্কেটেও (খুচরা বাজার) ডলার দর ছিল অনেকটাই স্থিতিশীল। কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে সর্বোচ্চ ১২৬ টাকায়। আর ব্যাংকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকায় ডলার লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে।